নবজাতক শিশুর বিষয়ে নানা কথা

image source: from net.নবজাতক বাচ্চার লালন পালন বিষয়ে বিভিন্ন সোর্স থেকে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে এই সব কন্টেন্ট।

নবজাতক শিশুর যত্ন – কী করবেন, কী করবেন না
নবজাতকের রক্তক্ষরণ সহজে প্রতিরোধ করা যায়
গরমে নবজাতকের যত্ন
শালদুধ বা কলস্ট্রাম
নবজাতকের নাভীর ইনফেকশন
বার্থ এসফেক্সিয়া (Birth asphyxia)
নবজাতকের ওজনহীনতা
আপগার স্কোর (APGAR score)



নবজাতক শিশুর যত্ন – কী করবেন, কী করবেন না
সন্তানের পরিচর্যা সঠিকভাবে জানতে পারলেই তবে ভালো মা-বাবার দায়িত্ব পালন সম্ভব। যাঁরা এই প্রথমবারের মতো মা-বাবার স্তরে উন্নীত হয়েছেন, তাঁরা শিশু-চিকিৎসক কিংবা নার্সের কাছে শিশু যত্নের বিভিন্ন খুঁটিনাটি জেনে নিতে পারেন। জগতের সব মা-বাবার মধ্যে সর্বজনীন অনুভূতি থাকে, সন্তানকে বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে, যত্ন-আত্তি দিয়ে গড়ে তোলার। তবে মনে রাখা দরকার, এতে কিন্তু মা-বাবাকে বেশ কিছু সময় দিতেই হবে।

তুলে নেওয়ার সময়
ছোট্ট শিশুকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় সর্বদা এক হাত মাথার নিচে রেখে সাপোর্ট দিতে হবে। কখনো মাথায় ধরে ঝুলিয়ে যেন তুলে না নেওয়া হয়।

জড়িয়ে রাখা
মা যেভাবে বাচ্চাকে সঠিক পদ্ধতিতে স্তন্যপান করান, সেভাবে উষ্ণ আলিঙ্গনে রেখে বাচ্চাকে কোলে রাখতে হয় এবং বাহু শিশুর মাথা ঘাড়ের পাশে থাকবে, অন্য বাহু ও হাতে শিশু-শরীরের বাকি অংশে সাপোর্ট দেবেন।

বুকের দুধ পানে
শিশুকে বুকের দুধ পানের সঠিক অবস্থান জেনে নিতে হবে। মা পিঠ সোজা রেখে বসবেন। শিশুর পেট মায়ের পেটের সঙ্গে লেগে যাবে। শিশু বড় হাঁ করে স্তনের বোঁটা নিয়ে নেবে। সিগারেট ধরার ভঙ্গিতে স্তনের বোঁটা শিশুর মুখে গুঁজে দেওয়া ভুল।

শিশুকে শোয়ানো
বেশি তুলতুলে নরম বিছানায় নবজাতক শিশুকে শোয়ানো উচিত নয়। এতে করে সে উল্টে গিয়ে তার নাক-মুখ চেপে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিছুটা শক্ত বিছানা ও দুই পাশে ছোট বালিশ ব্যবহার করুন।

শিশুকে জাগানো
শিশুকে জাগাতে তীব্র কোনো বাজনা পেটানো বা শব্দ সৃষ্টি না করা ভালো। তাকে আলতোভাবে চুম্বন-স্পর্শ দিন, আলতোভাবে গায়ে সুড়সুড়ি দিন। জেগে উঠবে। পিঠে বা শরীরের অন্য অংশে জোরে থাপড় বা ঝাঁকুনি দেওয়া অনুচিত।

শিশুর সঙ্গে খেলার সময়
ছোট্ট শিশুকে নিয়ে খেলার সময় ওকে এমনভাবে দুই হাতে ধরতে হবে, যেন হাত ছিটকে না পড়ে। হাত ছেড়ে শূন্যে খেলা করা এক সর্বনাশা পদক্ষেপ।

শিশুকে শান্ত করানো
শিশুকে শান্ত করতে কাছে যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে বশ করতে যাওয়া অনুচিত। এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বিপজ্জনক দ্রব্যও থাকতে পারে। বরং তাকে কাঁধে নিন। মায়া-মমতার পরশের হাত পিঠে বুলিয়ে দিন। শিশুর কান্না থেমে যাবে।

শিশুকে হাসাতে
শিশুকে হাসানোর প্রক্রিয়ায় তার মুখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দেন পরিবারের কোনো কোনো নির্বোধ সদস্য। বরং তার বয়স অনুযায়ী রংবেরঙের পুতুল নিয়ে তার সঙ্গে মজা করুন।

শিশুর নাক পরিষ্কার রাখতে
কোনো কোনো জন নবজাতকের নাক পরিষ্কার করতে নিজের অপরিচ্ছন্ন আঙুলের ডগা শিশুর নাসারন্ধ্রে ঢুকিয়ে চেষ্টা চালাতে থাকেন। কয়েক ফোঁটা লবণমিশ্রিত পানি শিশুর নাসারন্ধ্রে দিয়ে নরম পরিচ্ছন্ন কাপড় সুচোমুখ করে পরিষ্কার করা যায়। প্রয়োজনে ন্যাজেল অ্যাসপিরেটরের সাহায্য নেওয়া যাবে।

ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ১২, ২০১০



নবজাতকের রক্তক্ষরণ সহজে প্রতিরোধ করা যায়

শিশুর জন্মের পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে হঠাৎ শরীরের যেকোনো স্থান দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। সাধারণত রক্তক্ষরণ ছাড়া শিশুটির অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে না। এটিকে বলে হেমোরেজিক ডিজিজ অব নিউবর্ন বা নবজাতকের রক্তক্ষরণ।

কারণ: নবজাতকের শরীরে ভিটামিন ‘কে’-র অভাবে এ রোগ দেখা যায়। ভিটামিন ‘কে’ আমাদের শরীরে খাদ্যনালিতে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা তৈরি হয়। শিশুর জন্মের পর এই ব্যাকটেরিয়াগুলো খাদ্যনালিতে জন্মাতে কয়েক দিন লাগে। এ সময়ের মধ্যে যদি ভিটামিন ‘কে’-র মাত্রা যথেষ্ট পরিমাণে কমে যায়, তবেই রক্তক্ষরণের এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রকারভেদ: লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সময় শিশুর বয়সের ওপর ভিত্তি করে রোগটিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়—

১. জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রক্তক্ষরণ
সাধারণত গর্ভাবস্থায় খিঁচুনি ও যক্ষ্মা রোগের ওষুধ সেবন করলে নবজাতকের এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাধারণত তীব্র ক্ষরণের আশঙ্কা থাকে, এমনকি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গর্ভকালীন শেষ দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে মাকে ভিটামিন ‘কে’ ইনজেকশন প্রয়োগ করলে শিশুর রক্তক্ষরণ রোগটি প্রতিরোধ করা যায়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ নিতে হবে।

২. দ্বিতীয় দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে রক্তক্ষরণ
শিশুর সাধারণত অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে না। বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে এমন শিশু, যাদের ভিটামিন ‘কে’ খাওয়ানো হয়নি এদের ক্ষেত্রে বেশি লক্ষ করা যায়। রক্তক্ষরণ সাধারণত নাভি থেকে পায়খানার সঙ্গে, নাক দিয়ে বা ইনজেকশনের জায়গায় দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ সাধারণত হয় না।

৩. বিলম্বিত রক্তক্ষরণ
কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই রক্তক্ষরণের লক্ষণ দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে তিন মাস, এমনকি ছয় মাসের মধ্যে যেকোনো সময় দেখা যেতে পারে। রক্তক্ষরণ শরীরের যেকোনো জায়গা দিয়েই দেখা যেতে পারে। তবে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রেই বেশি থাকে। সাধারণত যেসব শিশু লিভার রোগে আক্রান্ত, দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসাধীন, ডায়রিয়া আছে ইত্যাদি ক্ষেত্রে এ ধরনের বিলম্বিত রক্তক্ষরণ হতে পারে।

রোগের উৎপত্তি
আমাদের শরীরে অন্যান্য ভিটামিনের তুলনায় ভিটামিন ‘কে’-র কার্যাবলি কিছুটা ভিন্ন। এই ভিটামিন আমাদের খাদ্যনালিতে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা তৈরি হয়।
জন্মগতভাবে শিশু মায়ের শরীর থেকে ভিটামিন ‘কে’ কম পেয়ে থাকে এবং এদের লিভারে এই ভিটামিনের মজুদ পর্যাপ্ত থাকে না। ভিটামিন ‘কে’ আমাদের শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য অত্যাবশ্যক কয়েকটি উপাদান সৃষ্টি করে। উপাদানগুলো সৃষ্টির প্রক্রিয়া লিভারে সংঘটিত হয়।
নবজাতকের শরীরে জন্মের পর প্রথম দিনগুলোতে এই ভিটামিনের মাত্রা কম থাকে এবং এই মাত্রা যথেষ্ট কমে গেলে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে রক্তক্ষরণের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

লক্ষণ
শরীরে রক্তক্ষরণ সব সময়ই আতঙ্কজনক একটি ব্যাপার! সাধারণত নাভি দিয়ে, পায়খানার সঙ্গে, নাক দিয়ে, মেয়েশিশুর যোনিপথে রক্তপাত হতে দেখা যায়। অনেক সময় চামড়ার নিচে রক্তপাতের কারণে লাল লাল দাগ দেখা দিতে পারে, এমনকি রক্ত জমা হয়ে জায়গাটি ফুলে যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ; যার কারণে শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে শিশু আকস্মিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বে। শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে অসাড় হয়ে যাবে, বুকের দুধ খাওয়া কমিয়ে দেবে, মাথার তালু ফুলে যেতে পারে, শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে, এমনকি খিঁচুনি পর্যন্ত হতে পারে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুকে মৃত্যুবরণ করতেও দেখা যায়।

প্রতিরোধের উপায়
আশার কথা হলো, নবজাতকের এই রক্তক্ষরণ প্রতিরোধে সহজ একটি চিকিৎসাপদ্ধতি বিদ্যমান। সেটি হলো ভিটামিন ‘কে’ ইনজেকশন প্রয়োগের মাধ্যমে। জন্মের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এ ইনজেকশনটি দিতে হয়। ইনজেকশন মাংসপেশিতে একবার প্রয়োগ করলেই যথেষ্ট। তবে মুখে খাওয়ালে তিন ডোজ নিতে হবে। প্রথম ডোজ নিতে হবে জন্মের চার ঘণ্টার মধ্যে। দ্বিতীয় ডোজ চতুর্থ দিনে এবং তৃতীয় ডোজ ২৮তম দিনে।
উল্লেখ্য, ভিটামিন ‘কে’ ইনজেকশন নেওয়ার পরও যদি রক্তক্ষরণের কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মনে রাখবেন
– নবজাতকের রক্তক্ষরণ কখনো কখনো মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করলেও একটু সচেতন হলে সহজেই এর প্রতিরোধ করা যায়।
– মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে হরমোনজনিত কারণে যোনিপথে রক্তক্ষরণ হতে পারে, যেটি অস্বাভাবিক নয়। এ ক্ষেত্রে রক্তপাতের পরিমাণ সাধারণত বেশি হয় না। শরীরের অন্য কোনো স্থান দিয়ে রক্তপাত হয় না এবং দু-তিন দিনের মধ্যে আপনা-আপনিই বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্য মেয়ে-নবজাতকের ক্ষেত্রে কেবল যোনিপথে রক্তক্ষরণ হলে কিছুটা ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
– জন্মের পর যত শিগগির সম্ভব শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করবেন এবং বারবার খাওয়ানোর অভ্যাস করবেন। শিশুর যেকোনো অসুস্থতায় চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা না থাকলে অবশ্যই বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাবেন।

অর্জুন চন্দ্র দে
সহকারী অধ্যাপক, নবজাতক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, ঢাকা।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ৩০, ২০১০



গরমে নবজাতকের যত্ন
নবজাতকের যত্ন বরাবরই একটু বেশি করা হয়। আর এই দুর্বিষহ গরমে তো কথাই নেই। নবজাতকের যত্ন প্রসঙ্গে জানিয়েছেন ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এরশাদুর রহিম। তিনি বলেন, গরমে সব শিশুকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা উচিত। আর নবজাতকের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাত্রা একটু বেশিই রাখতে হয়। নিয়মিত গোসল করালে অথবা নরম কাপড় ভিজিয়ে গা মুছে দিলে শিশুর জন্য তা আরামদায়ক হবে। এ ছাড়া এতে শিশুর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও বজায় থাকে।

এরশাদুর রহিম আরও জানান, নবজাতকের ত্বক খুব স্পর্শকাতর হয় বলে ত্বকের যত্নের ব্যাপারে অভিভাবকদের বাড়তি খেয়াল রাখতে হবে। অনেক অভিভাবকই প্রচুর পরিমাণে পাউডার বা তেল শিশুর ত্বকে ব্যবহার করেন, যা শিশুর ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত পাউডার ব্যবহারে শিশুদের ত্বকের রোমকূপগুলো বন্ধ হয়ে যায় বলে সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এতে শিশুর ঘামাচি ও ন্যাপি র‌্যাশও হতে পারে।

গরমে অভিভাবকদের কিছু সাবধানতা বজায় রাখার পরামর্শ দেন এরশাদুর রহিম। তিনি বলেন, অতিরিক্ত রোদে ছোট বাচ্চা নিয়ে বের হওয়া উচিত না। নবজাতকের সামনে হাঁচি-কাশি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। না হলে জীবাণু শিশুকে সহজে আক্রমণ করতে পারে। শিশুকে ঠান্ডা ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে রাখা উচিত। ঘেমে গেলে খেয়াল করে বারবার শুকনো নরম কাপড় দিয়ে গা মুছে দিতে হবে। তিনি বলেন, অবশ্যই এই গরমে শিশুকে সুতির নরম ও আরামদায়ক পোশাক পরানো উচিত।

নবজাতকের মাকে প্রচুর পরিমাণে তরলজাতীয় খাবার এবং পানি পান করতে হবে। এতে মায়ের বুকের দুধ থেকে শিশু উপকৃত হবে।

স্বাভাবিক যত্নের মাধ্যমেই নবজাতক স্বস্তিতে থাকবে আর অভিভাবকের সচেতনতাই দেবে নবজাতকের সুস্থ ও সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা।

ফারহানা জামান
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ২৫, ২০১০
সুত্র: http://banglahealth.evergreenbangla.com



শালদুধ বা কলস্ট্রাম
জন্মের ঠিক পর থেকে শুরুর ২/৩ দিন পর্যন্ত মা তার স্তন থেকে যে দুধ নিঃসরণ করে তাকে শালদুধ বলা হয়। শালদুধ নিয়ে অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠিতে অনেক কুসংস্কার আছে এজন্য অনেক নবজাতকই এমন দূর্লভ, অমূল্য একটি খাদ্য থেকে জন্মের পরপরই বঞ্চিত হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে শালদুধে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান (উচ্চমাত্রার আমিষ, স্নেহ ও শর্করা) ছাড়াও রয়েছে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার বেশ কিছু জরুরী উপাদান যার একটি ‘ইমিউনোগ্লোবিউলিন এ’ নামে পরিচিত। এটা শিশুকে রক্তের ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা করে। এছাড়া শাল দুধ শিশুর ক্ষুদ্রান্তকে ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা করে এবং শিশুকে কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝামেলা থেকে বাচায়। তাই প্রত্যেক সচেতন অভিভাবকের অবশ্য কর্তব্য জন্মের পর পর শিশুর শালদুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

সুত্র: http://susastho.com/child/child-nutrition/46-colostrum.html



নবজাতকের নাভীর ইনফেকশন
নবজাতকের নাভী দিয়ে যদি সাদা দুর্গন্ধযুক্ত পুজের মতো কিছু আসে তখন ধরে নিতে হয় বাচ্চার নাভীতে ইনফেকশন বা Umbilical sepsis হয়েছে। এ অবস্থায় নাভীর চারপাশটা লালচে হয়ে যায় এবং নাভী দিয়ে ক্রমাগত ভাবে স্রাব আসতেই থাকে।

স্টেফাইলোকক্কাস নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনে এমনটি হয়ে থাকে, নাভীর স্রাবের কালচার পরীক্ষা করে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়। অনেক সময় নাভী থেকে এটি লিভারে গিয়ে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরতে পারে তখন জন্ডিস, লিভারের ফোড়া সহ ভয়াবহ অবস্থার আবির্ভাব হতে পারে। কখনো কখনো এ ইনফেকশন হাড় অথবা অন্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পরতে পারে। তাই সন্দেহ হবার পর দ্রুত শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।

জন্মের পরপরই নাভীর যত্ন নিলে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। রোগটি হয়ে গেলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে এ রোগ ভালো হয়ে যায়। রোগটি অল্পমাত্রায় হলে নাভীটি স্পিরিট দিয়ে ঘন ঘন পরিস্কার করতে হয় সেই সাথে পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক পাউডার প্রয়োগ করতে হয়। রোগটি ছড়িয়ে পরলে হাসপাতালে ভর্তি করে শিরায় এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেয়া সহ অন্যান্য চিকিৎসা করতে হয়।

সুত্র: http://susastho.com/child/sick-child/44-umbilical-sepsis.html



বার্থ এসফেক্সিয়া (Birth asphyxia)
নবজাতক জন্মের সাথে সাথেই যদি নিজে নিজে নিঃশ্বাস নিতে ব্যর্থ হয় তাকে বার্থ এসফেকশিয়া বা এসফেকশিয়া নিউনেটারাম বলে। সাধারণত এ ধরনের শিশুদের জন্মের ৫ মিনিট পর আপগার স্কোর ৬ এর নীচে থাকে, যদি তা ৩(তিন) এর নীচে নেমে যায় তাহলে ধরে নিতে হবে শিশুটির অবস্থা বেশ জটিল।

গর্ভাবস্থায় যদি মায়ের নিউমোনিয়া, হার্ট ফেইলুর, খীচুনি, রক্তস্রাব বা এক্লামপসিয়া (Ecclampsia) জাতীয় কোনো রোগ থাকে তাহলে শিশুর এস্ফেক্সি্ইয়া নিউনেটারাম হতে পারে। এছাড়া প্রসবের সময় শিশুর গলায় অনেক্ষন নাড়ীর প্যাচ লেগে থাকা, মাথায় রক্তপাত হওয়া বা আঘাত পাওয়া কিংবা কিছু অসুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারনেও এমন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

একজন নবজাতক বিশেষজ্ঞ বা নিউন্যাটোলজিস্ট (Neonatologist) এই রোগ নিরাময়ে সর্বাপেক্ষা অধিক ভূমিকা রাখতে পারবেন। শিশু জন্মের ১ মিনিট এর মধ্যে ও যদি শ্বাস না নেয় তাহলে দ্রুত তার মুখ গহবর পরিষ্কার করে মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দিতে হবে এবং শিশুকে অতি দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, লক্ষ্য রাখতে হবে শিশুর তাপমাত্রা যেনো কোনোভাবেই কমে না যায় এজন্য তাকে উষ্ণ কাপড়ে মূড়ে রাখতে হবে।

হাসপাতালে ভর্তি রোগীকে সাকশন (suction) দিয়ে মুখ ও পেট খালি করা হয় এবং ৮০% অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়। জন্মের তিন মিনিটের মধ্যেও শ্বাস না নিলে মুখে বা গলায় নল দিয়ে কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস দিতে হয় সেই সাথে হাতের তালু দিয়ে বুকে ঘন ঘন চাপ দিয়ে (Cardiac massage) হৃদপিন্ড সচল রাখতে হয়।

বার্থ এসফেক্সিয়া তীব্র হলে বা চিকিৎসা করতে সামান্য দেরী হয়ে গেলে শিশু মানসিক প্রতিবন্ধকতা, মৃগী রোগ, নির্জীব থাকা বা প্যারালাইসিস(Cerebral palsy) সহ নানা জটিলতায় ভুগতে পারে, এ রোগে শিশুর মৃত্যুর হার ও অত্যাধিক।

সুত্র: http://susastho.com/child/sick-child/42-birth-asphyxia.html



নবজাতকের ওজনহীনতা
জন্মের সময় শিশুর ওজন যদি আড়াই কেজি(কিলোগ্রাম) এর কম হয় তাহলে ধরে নেয়া হয় শিশুটি এল,বি,ডাব্লিউ বা Low birth weight baby (LBW). এই ওজন যদি দেড় কেজিরও কম হয় তাহলে তাকে খুব কম ওজনের শিশু বা Very low birth weight (VLBW) এবং ৭৫০ গ্রামের কম ওজনের হলে চরম ওজনহীন শিশু Extreme low birth weight (ELBW) বলা হয়।

কিশোরী মাতার সন্তানের ওজন সাধারণত খুব কম হয় এবং গর্ভে শিশু পরিণত বয়সপ্রাপ্ত হবার আগেই (Preterm) ভূমিষ্ঠ হলেও ওজন খুব কম হয়। এছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের যদি ডায়াবেটিস (Diabetes), হৃদরোগ, কিডনি রোগ, পুষ্টিহীনতা, রক্তশুন্যতা, বড় কোনো ইনফেকশন, টক্সেমিয়া (Toxaemia), রক্তস্রাব বা এইধরনের জটিল কোনো রোগ থাকে তাহলে নবজাতকের ওজন কম হতে পারে। জমজ শিশু বা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুদের ওজন কম হতে পারে, ধুমপায়ী মায়েদের সন্তানেরও জন্মের সময় ওজন বেশ কম থাকে।

কম ওজনের নবজাতক খুব কম সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে যেতে পারে তাই এসকল শিশুর ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নিতে হয়। সবসময় শিশুটিকে উষ্ণ রাখতে হবে, তাপমাত্রা কমতে দেয়া যাবেনা, পরিস্কার হাতে শিশুকে ধরতে হবে এবং শিশুর পরিধানের কাপড়ও খুব পরিস্কার রাখতে হবে। শ্বাস নিতে কোনো সমস্যা হলে সাথে সাহে মুখের ভেতরের লালা এবং নাকের সর্দি পরিস্কার করে দিতে হবে।

শিশুর ওজন বেশ কম হলে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করে শিশু বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। সঠিক পুস্টির জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি নাকে নল দিয়ে খাবার দেয়া এমনকি শিরার মাধ্যমেও খাবার দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। শিশুর তাপমাত্রা কমে গেলে তাকে ইনকিউবেটর (Incubator) এ দিতে হবে। ইনফেকশন প্রতিরোধ করার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন এনটিবায়োটিক সেই সাথে কিছু ভিটামিন এবং ফেনোবারবিটোন (Phenobarbitone)জাতীয় অসুধ ও দিয়ে থাকেন। নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে ভুমিষ্ঠ হওয়া (Preterm) শিশুর অবস্থা খুব খারাপ হলে শিশুকে এন,আই,সি,ইউ (NICU – Neonatal Intensive Care Unit) তে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া লাগতে পারে।

সুত্র: http://susastho.com/child/sick-child/41-low-birth-weight.html



আপগার স্কোর (APGAR score)
জন্মের পর পরই নবজাতকের সার্বিক অবস্থা অনুধাবনের জন্য যে পর্যবেক্ষন করা হয় তার সংখাবাচক প্রকাশই হলো আপগার স্কোর (APGAR score)। যে সকল শিশু জন্মের পরপরই শ্বাস কষ্ট নিয়ে জন্মায় তাদের জন্মের সাথে সাথে এবং ৫ মিনিট পর আপগার স্কোর করে দেখা হয়। অন্য সকল স্বাভাবিক শিশুকেও আপগার স্কোর করে দেখা হয়।

ইংরেজি ৫টি অক্ষর ‘এ’ ‘পি’ ‘জি’ ‘এ’ ‘আর’ এর সমন্বয়ে APGAR শব্দটি গঠিত। A দিয়ে এপিয়ারেন্স(Appearance) বা বাহ্যিক দর্শন, গায়ের বর্ণ (নিল না স্বাভাবিক) P দিয়ে পালস(Pulse) বা নাড়ীর গতি(হৃদ স্পন্দন) G দিয়ে গ্রিমেস(Grimace) – ব্যথা বা খোচা লাগার পর বাচ্চার কান্নাকরা/মুখভঙ্গী A দিয়ে একটিভিটি(Activity) বা হাত-পা নাড়ার ক্ষমতা, R দিয়ে রেসপিরেশন(Respiration) বা শ্বাস প্রশ্বাসের অবস্থা নির্দেশ করা হয়। এই ৫টি বিষয়ের প্রতিটিকে আবার ০,১,২ এভাবে ভাগ করে নিরুপন(assess) করা হয়। ২ পেলে বাচ্চা ভালো আছে আর শুন্য পেলে খারাপ। এভাবে মোট আপগার স্কোর ১০ এর মধ্যে কেউ যদি ৮-১০ পায় ধরে নেয়া হয় সে খুবই সুস্থ্য আছে আর ৪-৭ পেলে মোটামূটি ভালো। কোনো বাচ্চার আপগার স্কোর ০-৩ থাকলে পরিস্থিতি আশংকাজনক বলে ধরে নেয়া হয়।

সুত্র: http://susastho.com/child/child-growth/40-apgar-score.html


এই তথ্যগুলি বিভিন্ন সোর্স থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। যদি কোন তথ্য সম্পর্কে আপনার কোন অভিযোগ থাকে, অবশ্যই মন্তব্য আকারে জানাবেন।

Advertisements

One Response to নবজাতক শিশুর বিষয়ে নানা কথা

  1. পুরু দেব বলেছেন:

    তথ্যগুলো জানানোর জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s