শিশুর আক্রমনাত্মক আচরণ

লিখেছেন: SEFAT MAHJABEEN

কিছু কিছু শিশুদের মাঝে দেখা যায় সে প্রায়ই হঠাৎ করেই রেগে যায়। রেগে গিয়ে সবাইকে মারতে থাকে। আবার কেউ কেউ কামড়ও দেয়। শিশুর আক্রমনাত্মক এই আচরণ তার স্বাভাবিক বৃদ্ধির একটা অংশ। সাধারনত কথার মাধ্যমে মনের ভাবপ্রকাশ করতে অপারগ হলে, রেগে গেলে সাধারণত শিশুরা এই কাজগুলো করে থাকে। ২-৩ বছরের শিশু যাদের এখনও ভাষা শিখতে বাকী, তাদের ভেতর এই মারামারি বা কামড়ানোর একটা প্রবণতা দেখা যায়। তাকে বহুবার নিষেধ করার পরও এটা সে করে। একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আঘাত করা ও কামড়ানো শিশুদের জন্য স্বাভাবিক।

যা করনীয়ঃ

অনেক সময় নিজেকে প্রকাশ করতে না পারলেই শিশুরা রেগে যায়। অনেক সময় বড়রা ছোট বাচ্চাদের রাগিয়ে ‘মজা’ পায়। আবার কখনো পিঠাপিঠি ভাইবোন থাকলে সে ছোটজনকে বিরক্ত করে। অনেক সময় বাসার পরিবেশটাই তার জন্য বিরূপ হয়। বাবা মাকে বাচ্চার সামনে মারছে, বা মা কাজের লোককে বাচ্চার সামনে মারছে, কিম্বা বাবা/মা বাচ্চাকে সামান্য কারণেই মারছে। সে শিখছে “নিজের মতের বিরুদ্ধে কিছু হলেই মারতে হয়”! তাই আগে রাগের কারন অনুসন্ধান করুন। নিজেকে শিশুর জায়গায় কল্পনা করুন। কখন আপনার রাগের চোটে অন্যকে মারতে ইচ্ছা করে, অথচ নিজেকে কনট্রোল করেন? আপনি কথা বলতে পারছেন, তাই সেটা প্রকাশ করতে পারছেন। কিন্তু সে পারছে না বলেই হয়তো মারামারি করছে।

যদি খেলার সময় অন্য বাচ্চার সাথে মারামারি করে তাহলে তাকে আলাদা করে ডেকে নিন। তাকে নিয়ে বসে কিছুক্ষণ ঠাণ্ডা হওয়ার সময় দিন। তারপর তাকে বলুন সে অন্য বাচ্চাকে আঘাত না করে খেলাটা এনজয় করতে প্রস্তুত থাকলে আপনি তাকে খেলতে দিবেন।
বাচ্চার সাথে তর্কে যাবেন না। তাকে এমন প্রশ্ন করবেন না, “তোমার কেমন লাগত যদি সে তোমাকে মারতো/কামড় দিত”? শিশুরা নিজেকে অন্য আরেকজনের জায়গায় বসিয়ে তার অনুভূতি কল্পনা করার মতো দক্ষতা এখনও অর্জন করেনি আর তাই এর মাধ্যমে তাদের আচরণের পরিবর্তন করা যায় না। কিন্তু তারা একটা অন্যায় কাজের ফলাফল কি হয় তা বুঝতে সক্ষম।

আপনার মাথা ঠান্ডা রাখুন। তাকে শাসন করলে, ধমকালে, মারলে তার আচরণে কোন পরিবর্তন আসবে না বরং সে আরো বেশী করে ঐ কাজগুলো করবে। আসলে সে আপনার শাসনের অনুকরণ করবে। আপনি কিভাবে আপনার রাগ কন্ট্রোল করছেন তা দেখে সেও শিখতে পারে তার রাগ সে কিভাবে কন্ট্রোল করবে। কিছু নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিন।

সে যখন আক্রমনাত্মক হচ্ছে সাথে সাথে আপনার প্রতিক্রিয়া তাকে জানান। তাকে বলবেন, “তুমি যদি আবার মারো/কামড় দাও তাহলে আবার তোমাকে অন্য ঘরে রেখে আসা হবে”। সময়ের সাথে সাথে তার মাথায় ঢুকে যাবে যে সে দুষ্টমি করলে তার ভাগ্যে রয়েছে টাইম আউট। ফলে সে তার আচরণ সংশোধন করবে।

সে তার ভাই/বন্ধু/কাজিনকে পরবর্তী আঘাত করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না। বরং সে যখন অন্যায় কিছু করছে তখন সাথে সাথেই তাকে সেটা জানাতে হবে। তাকে সেখান থেকে কয়েক মিনিটের জন্য সরিয়ে নিন। এটাই সবচেয়ে ভালো উপায় তার মেজাজ ঠান্ডা করার, তারপর সে যখন আবার ফিরে আসবে সে বুঝতে পারবে সে যদি আবার মারামারি করে অথবা কামড়ায় তাহলে তাকে আবার সেখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

যদি বাইরে থাকেন আর আপনার শিশুর ব্যবহারে খুবই অপ্রস্তুত হয়ে যান তবুও তাকে বাইরের লোকের সামনে বেশী বকবেন না। বাসায় এসে আপনার শিশু শান্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তারপর শান্তভাবে যা ঘটেছে তা রিভিউ করুন। তার উম্মাদনার কারণটা কি ছিল তা সে ব্যাখ্যা করতে পারবে কিনা জিজ্ঞেস করুন। তাকে বলুন “রাগ হওয়া খুব স্বাভাবিক কিন্তু রাগ করে ঘুষি দেয়া, লাথি দেয়া অথবা কামড়ানো একদমই ঠিক না”। তার রাগ প্রকাশের কোন একটা ভালো উপায় খুঁজতে তাকে উৎসাহ দিন- যেমন কথা বলার মাধ্যমে। অথবা রেগে গেলে বড় কারো সাহায্য চাওয়া।

আপনার শিশু কারো সাথে খারাপ আচরণ করার পর সে তাকে “সরি” বলছে তা নিশ্চিত করুন। প্রথম দিকে তার দুঃখ প্রকাশ করাটা হয়ত মন থেকে হবে না কিন্তু এই শিক্ষাটা স্থায়ী হয়ে থাকবে। এক সময় কাউকে ব্যাথা দেবার পর দুঃখ প্রকাশ করা তার অভ্যাসে পরিণত হবে।

শিশুকে প্রতিনিয়ত নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখান। তার ভালো আচরণগুলো যেন আপনার চোখ না এড়িয়ে যায়। ভালো আচরণের জন্য উপহার দিন। তার খারাপ আচরণগুলোই শুধু লক্ষ্য করবেন না। যখন সে অপেক্ষা করছে, অন্য কোন শিশুকে ধাক্কা দিচ্ছে না বা মারছে না, তখন তার প্রশংসা করুন। তার ইচ্ছা প্রকাশ করার জন্যও তার প্রসংশা করুন। একটা সময় সে বুঝতে পারবে ভাষা কত শক্তিশালী।

শিশুর টিভি টাইম সীমাবদ্ধ করুন। শিশুদের জন্য তৈরী কার্টুন ও অন্যান্য শো গুলোতে অনেক চিৎকার, ক্ষতিকর আচরণ ও মারামারির দৃশ্য থাকতে পারে। সে যদি বেশী আক্রমনাত্মক হয় তাহলে খেয়াল করুন সে কোন ধরনের প্রোগ্রাম দেখছে। যখন আপনার শিশু টিভি দেখছে তখন আপনিও তার সাথে বসে টিভি দেখুন আর তার সাথে যা ঘটছে তা নিয়ে কথা বলুন।

তাকে শারীরিক কসরতের সুযোগ করে দিন। আপনার শিশু যদি তার শক্তি খরচ করার জায়গা না পায় তাহলে সে ঘরে মাত্রাতিরিক্ত দুষ্টামি করবে। শিশু যদি খুব প্রাণবন্ত হয়, তাহলে তাকে অনেক বেশী সময় দিন। সেটা ঘরের বাইরে হলেই ভালো, তাহলে সে তার বাড়তি শক্তি খরচ করতে পারবে।

কখনো কখনো শিশুর রাগ থামানোর জন্য শুধুমাত্র মা-বাবার একার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
১) আপনার শিশুযদি কয়েক সপ্তাহ/মাস সময় ধরে অস্বাভাবিক ভাবে আক্রমনাত্মক আচরণ করতে থাকে
২) সে যদি অন্য শিশুদের ভয়ের কারণ হয়
৩) সে যদি রেগুলার বড়দের আক্রমণ করে
এবং
৪) তার আচরণ নিয়ন্ত্রণে আপনার চেষ্টায় কোন কাজ না হয়

তাহলে আপনার শিশুর ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। তিনি কোন কাউন্সেলর অথবা শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের বা চাইল্ড সাইকোলজিষ্ট এর পরামর্শ গ্রহণ করতে বলতে পারেন। একত্রে আপনারা তার আক্রমনাত্মক আচরণের কারণটা কি সে সম্পর্কে জানতে পারবেন আর আপনার শিশুকে সাহায্য করতে পারবেন। মনে রাখবেন আপনার শিশু এখনও খুবই ছোট। আপনি যদি তার সাথে ধৈর্যের সাথে কাজ করতে থাকেন তাহলে তার এই আক্রমনাত্মক আচরণগুলো শিঘ্রই ঠিক হয়ে যাবে।
This entry was posted in শিশু লালন পালন বিষয়ক. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s