ভিটামিন ‘এ’ কেলেঙ্কারি শিশুদের ভিটামিন খাওয়ানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে – প্রথম আলো

2013-01-09-19-16-17-50edc20103a67-untitled-5দেশের আড়াই কোটি শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি বলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় দিন নির্ধারণ করতে পারছে না।

বিশ্বব্যাংকের কথায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান পরীক্ষা করেছে ভারতের এসজিএস প্রাইভেট লিমিটেডের পরীক্ষাগারে। এ পরীক্ষা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ক্যাপসুলের নমুনা নতুন পরীক্ষাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কবে পরীক্ষার ফল সরকারের হাতে আসবে, কবে শিশুদের ভিটামিন খাওয়ানোর দিন ঠিক হবে, তা নিশ্চিত করতে পারছেন না সরকারি কর্মকর্তারা। 

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কিছু কর্মকর্তার অদক্ষতার কারণে ভিটামিন ‘এ’ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে সরবরাহ কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা বিশ্বব্যাংকের ওয়াশিংটন কার্যালয় খতিয়ে দেখছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত বছরের ২ জুন পাঁচ বছরের কম বয়সী দুই কোটি ছয় লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ায়। ছয় মাস পর পর এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হয়। সরকার ৫ জানুয়ারি ক্যাপসুল খাওয়ানোর দিন নির্ধারণ করেছিল। ৩ ডিসেম্বর এ কর্মসূচি বাতিল করা হয়।

সন্দেহের সূত্রপাত: ভারতের ওলিভ হেলথকেয়ারের সরবরাহ করা ১০ কোটি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরকারের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) গুদামে পৌঁছায় গত অক্টোবরে। ৬ নভেম্বর বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের স্বাস্থ্য খাত উন্নয়ন কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জ্যাকলিন টি এফ মোহন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে ক্যাপসুল বিতরণ করার আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রত্যয়নকৃত পরীক্ষাগারে ক্যাপসুলের মান যাচাইয়ের কথা বলেন। চিঠিতে মান সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে ক্যাপসুল বিতরণ না করার কথা বলা হয়। সরবরাহকারীদের যোগ্যতা সম্পর্কেও ওই চিঠিতে প্রশ্ন আছে।
কাগজপত্রে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার ভারতের মুম্বাইয়ের এসজিএস প্রাইভেট লিমিটেডে নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়। ২০ ডিসেম্বর এসজিএস ভারতের এদেশীয় এজেন্ট এসজিএস বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে পরীক্ষা প্রতিবেদন পাঠায়।

প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছিলেন এসজিএস বাংলাদেশের ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন।

সূত্র বলেছে, বিশ্বব্যাংক এতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তারা ভারতের মূল প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন দেখতে চায়। ২৮ ডিসেম্বর ভারতের এসজিএস পরীক্ষা প্রতিবেদন পাঠায়। ৩০ ডিসেম্বর সিএমএসডি তা বিশ্বব্যাংকে পাঠায়। ৩১ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাংক চিঠি দিয়ে জানায়, সিএমএসডি তথ্য অনুযায়ী নমুনাগুলো প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন। তবে পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

সন্দেহের কারণ: পরীক্ষার দুটি প্রতিবেদনই প্রথম আলোর কাছে আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেছেন, এ পরীক্ষার সময় আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণ করা হয়নি। পক্ষপাতের ঝুঁকি এড়াতে নমুনা পাঠানোর সময় পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা লুকিয়ে রাখা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ভারতের মান যাচাইকারীরা জেনেছেন, পণ্যটি ভারতেই তৈরি। তিনি বলেন, এ ক্যাপসুল কত দিন ব্যবহার করা যাবে, তা-ও পরীক্ষা প্রতিবেদনে নেই।

৮ ডিসেম্বর এসজিএস কার্যালয়ে গিয়ে প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে দেখা করা যায়নি। সিএমএসডিতে গিয়ে জানা যায়, পরিচালক ঢাকার বাইরে। প্রথম আলোর কাছে মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. হুমায়ুন কবির দাবি করেছেন, পদ্ধতি ঠিকই আছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক ক্যাপসুল একাধিক পরীক্ষাগারে যাচাই করাতে বলেছেন।

পেছনের ঘটনা: ৬ নভেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া বিশ্বব্যাংকের চিঠিতে ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের ইঙ্গিত আছে। ওই সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, সরকারি কর্মকর্তারা দুটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ভিটামিন ‘এ’ নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ইউনিসেফসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৭৪ সালে সরকারিভাবে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো শুরু হয়। দু-এক বছর বাদ দিয়ে এত বছর কানাডার ব্যানার ফার্মা কোম্পানির ক্যাপসুল সরকার ব্যবহার করেছে।

গত বছর ১০ কোটি ক্যাপসুল কেনার দরপত্রে তিনটি কোম্পানি অংশ নেয়। একটি কোম্পানি প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ যায়। অন্য দুটি ছিল ব্যানার ফার্মা (স্থানীয় এজেন্ট এসএস সায়েন্টিফিক করপোরেশন) এবং ওলিভ হেলথকেয়ার ইন্ডিয়া (স্থানীয় এজেন্ট জনতা ট্রেডার্স)। অন্যান্য শর্তের মধ্যে একটি ছিল দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের ২০১০ ও ২০১১ সালে ২০ কোটি ক্যাপসুল সরবরাহের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

ব্যানার ফার্মার এ অভিজ্ঞতা থাকলেও তারা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা বেশি মূল্য নির্ধারণ করেছিল। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ওলিভ হেলথকেয়ারকে ক্যাপসুল সরবরাহের কার্যাদেশ দেয়। ওলিভ বলেছিল, নাইজেরিয়ায় ২০ কোটি ক্যাপসুল সরবরাহের অভিজ্ঞতা তাদের আছে। ‘মেডফোড নাইজেরিয়া’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা সরবরাহ করেছে।

কিন্তু ব্যানার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংককে অভিযোগ করেছে, নাইজেরিয়ার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। এদের ৯১ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পায়। ইউনিসেফ ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ইনিশিয়েটিভ মূলত এ ক্যাপসুল সরবরাহ করে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ২০ কোটি ক্যাপসুল সরবরাহ করার কোনো সুযোগ নেই।

বিশ্বব্যাংকের ইন্টেগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সির একজন কর্মকর্তা ২৬ নভেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্তত দুজন পরিচালক ও একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলেন। বিশ্বব্যাংকের অনুসন্ধান এখনো অব্যাহত আছে। তবে ঢাকা কার্যালয়ের কেউ এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে এই প্রতিবেদক ৮ জানুয়ারি জনতা কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। এই প্রতিবেদককে জানানো হয়, মালিক বা গুরুত্বপূর্ণ কেউ অফিসে নেই। তাঁদের ফোন বা ই-মেইল ঠিকানাও দেওয়া হয়নি।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, দরপত্র যাচাইয়ের প্রথম দিকে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির একাধিক সদস্য ওলিভ হেলথকেয়ারের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন। পরে তাঁদের আর কমিটির সভায় আসতে দেওয়া হতো না।

এ ব্যাপারে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, মেডফোড নাইজেরিয়ার সঙ্গে তাঁরা টেলিফোনে কথা বলেছেন। ই-মেইলেও যোগাযোগ হয়েছে। ভিটামিন সরবরাহের ইনভয়েসও তারা পাঠিয়েছে। এর ভিত্তিতে তাঁরা অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন।

সোর্স: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-01-10/news/320064

Advertisements
This entry was posted in পত্র পত্রিকা, স্বাস্থ্য. Bookmark the permalink.

ভিটামিন ‘এ’ কেলেঙ্কারি শিশুদের ভিটামিন খাওয়ানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে – প্রথম আলো-এ 2টি মন্তব্য হয়েছে

  1. এত দুঃখ কোথায় রাখি। কোন কিছুতেই আমাদের সততা নেই!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s