নবজাতকের জন্য (শীতে শিশুর যত্ন) – প্রথম আলো

খাদিজা ফাল্গুনী | তারিখ: ১১-১২-২০১২

শীতে শিশুদের ঠান্ডা লাগার প্রবণতা বেশি থাকে। নবজাতক হলে তো কথাই নেই। তার জন্য চাই সর্বোচ্চ সতর্কতা। ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় থেকেই এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া চাই। শীতকালের চিরাচরিত উলের পোশাক শিশুর কোমল শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নবজাতকের শীতের পোশাক হতে হবে তার মতোই কোমল। 

শূন্য থেকেই সতর্কতা…
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল মান্নান জানান, শীতকালে নবজাতকের দেহের তাপমাত্রা ধরে রাখার প্রতি মনোযোগী হতে হবে সে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই। তাঁর পরামর্শ হলো, স্বাভাবিকভাবে যদি ঘরে পূর্ণ গর্ভাবস্থায় শিশুর (পূর্ণ ৩৭ সপ্তাহ) জন্ম হয় তাহলে কক্ষের তাপমাত্রা ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হতে হবে। জন্মের পর নবজাতক যে কক্ষে থাকবে তখনো এটি প্রযোজ্য। রুম হিটার জ্বালিয়ে, দরজা-জানালা বন্ধ রেখে এ তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে পারেন। অনেকে ঘরের কোণে কয়লা ও তুষের আগুন রাখেন। সে ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকুন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই নবজাতকের শরীর সুতির পুরোনো পরিষ্কার ও নরম কাপড়ে মুছে ফেলুন। শরীরে গর্ভজাত তরল লেগে থাকলে খুব দ্রুত দেহের তাপ বের হয়ে যায়, যাকে ইভাপোরেটিভ হিট লস বলে। নবজাতককে আলাদা বিছানা বা ঠান্ডা কোনো স্থানে রাখার বদলে মায়ের পেটের বা বুকের ওপর রাখুন। খেয়াল রাখবেন, নবজাতকের ত্বকের সঙ্গে মায়ের ত্বক লেগে থাকবে। তারপর নবজাতককে উষ্ণ কাপড়ে ঢেকে যত দ্রুত সম্ভব শালদুধ খেতে দিন। এতে থাকা গ্লুকোজ, প্রোটিন, চর্বি শিশুর শরীর উষ্ণ করে। দুধ খেতে হালকা ব্যায়াম হয় বলে শরীর নিজ থেকেই উত্তাপ তৈরি করা শুরু করে।

কী করবেন না
মো. আবদুল মান্নান বলেন, শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই প্রচলিত কিছু আচরণের কারণে শীতে নবজাতকের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই শিশুকে গোসল করিয়ে ফেলা আমাদের দেশের চিরাচরিত দৃশ্য। কারণ, নবজাতকের দেহে জন্মের পর পরই একপ্রকার সাদা আবরণ দেখা যায়। অনেকেই এটি নোংরা ভেবে মুছে দেন বা গোসল করিয়ে ধুয়ে দেন। কেউ লিকুইড প্যারাফিনেও মুছে ফেলেন। কিন্তু এটি মূলত নবজাতকের সুরক্ষা কবচ। এটি নবজাতকের দেহের তাপমাত্রা ধরে রাখে, যেকোনো জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধ করে এবং ত্বককে সুরক্ষা দেয়। প্রায় সবাই এক দিনের মধ্যেই মাথার চুল কামিয়ে দেন। কিন্তু কখনো কখনো এর ফলে নবজাতকের নিউমোনিয়া পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। চুল নবজাতকের মাথার তাপমাত্রা ধরে রাখে। খুব বেশি বড় চুল হলে এবং তাতে সমস্যা তৈরি হলে কাঁচি দিয়ে বড়জোর একটু ছেঁটে দেওয়া যাবে। রোদে দেওয়ার জন্য অনেকে নবজাতককে ভোরের ঠান্ডা বাতাসে খালি গায়ে ফেলে রাখেন। শীতের ঠান্ডা বাতাস, কুয়াশা বা মেঘলা অবস্থায় শিশুকে বাইরে নেওয়াই অনুচিত। রোদ উঠলে ও বাতাস কম থাকলে বেলা ১২টার আগে নবজাতককে কোলে নিয়ে রোদে বসতে হবে। শরীর উষ্ণ হয়ে উঠতে থাকলে একটি একটি অঙ্গ করে পুরো শরীরে রোদ লাগাতে হবে, তাও আধা ঘণ্টার বেশি নয়। বিকেলের রোদ নবজাতকের শরীরে লাগানো ক্ষতিকর।

আরেকটি প্রচলিত আচরণ হলো, নাভির নাড়িতে তেল মেখে রোদে রাখা। মনে রাখবেন, এতে সংক্রমণের পথই শুধু তৈরি করা হয়। নাভি থাকবে উন্মুক্ত কিন্তু যেকোনো কিছুর স্পর্শ ছাড়া। বড়জোর ঢোলা সুতির পোশাকে ঢেকে রাখা যাবে। ডায়াপার পরালে তাও থাকবে নাভির নিচে। এক ডায়াপার ৪ ঘণ্টার বেশি কোনোভাবেই রাখা যাবে না।

হাড় শক্ত করতে ও শরীর গরম করতে নবজাতকের শরীরে তেল বা লোশন মালিশ করাটা আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত। অথচ চিকিৎসকেরা বলেন, প্রথম এক মাস শিশুকে তেল, সাবান, পাউডার, লোশন, ক্রিম, কালি, কাজল কিছুই ছোঁয়ানো যাবে না। দুই থেকে তিন মাস পর অলিভ অয়েল বা সরিষার তেল মালিশ করা যেতে পারে। অনেকেই উন্নত মানের ভেবে বিদেশি কোম্পানির তেল, লোশন ব্যবহার করেন। এগুলো আমাদের দেশের আবহাওয়ায় ব্যবহারের উপযোগী কি না দেখে নিন। এসবে শিশুর অ্যালার্জির আশঙ্কাও থাকে।

কুসুম কুসুম পানিতে গোসল…
শীতকালে অন্তত এক মাস নবজাতককে সরাসরি পানিতে গোসল করানো অনুচিত। সময়ের আগে ভূমিষ্ঠ হওয়া বা প্রি-ম্যাচিওরড বেবিকে দুই মাস গোসল করানো ঠিক হবে না। তিন দিন পর কুসুম কুসুম গরম পানিতে শরীর হালকা মুছে দিতে পারেন। এক মাস বা দুই মাস পর সপ্তাহে এক দিন পানিতে গোসল করানো যাবে। গোসল বা গা মোছানোর পানি প্রথমে ১০ মিনিট ধরে ফুটিয়ে নিতে হবে। তারপর হালকা কুসুম গরম করে নিতে হবে। পানিতে জীবাণুনাশক তরল মেশানো যাবে না। পানি সূর্যের রোদে গরম করা হলেও হবে না। শিশুর গোসল অবশ্যই বদ্ধ কোনো ঘরে হতে হবে। এর ফলে বাতাসে নবজাতক ঠান্ডায় আক্রান্ত হবে না।

পোশাক হবে কোমল…
নবজাতককে সরাসরি উলের পোশাক পরানো ঠিক নয়। চিকিৎসকেরা বলেন, উলের ক্ষুদ্র লোমে অ্যালার্জি হতে পারে। সুতির পোশাকের ওপর উলের সোয়েটার চাপাতে পারেন, অন্তত তিন প্রস্থ পোশাক নবজাতককে পরাতে হয়। তা হতে পারে কাঁথা ও কম্বল। অবশ্যই তা হবে শিশুর উপযোগী। দ্য বেবি শপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা আলী জানান নবজাতকের উপযোগী পোশাক সম্পর্কে। তিনি জানান, দেশেই পাওয়া যায় নবজাতকের ব্যবহারের উপযোগী পোশাক। এগুলো তৈরি হচ্ছে সুতি, উল ও অন্যান্য উষ্ণ কাপড়ে। নবজাতকের পোশাকের মধ্যে আছে বডি স্যুট ও রম্পার। এগুলোর মাধ্যমে জামা ও প্যান্টের কাজ একসঙ্গে চলবে। আরও আছে বেবি স্যাক। এটি অনেকটা ছালার মতো, কিন্তু কাজ করে কম্বলের। নবজাতককে সামনে থেকে খোলা যায় এমন পোশাক পরানো উচিত। বেবি স্যাকের সামনে চেইন লাগানো বলে সে সুবিধা পাওয়া যায়। এ ছাড়া নবজাতককে হাফহাতা বা ফুলহাতা সোয়েটার, টি-শার্টও পরাচ্ছেন অনেকে। শীতে নবজাতককে অবশ্যই হাতমোজা, পা-মোজা ও কানটুপি পরাতে হবে। তবে মনে রাখবেন, নবজাতকের দেহের আচ্ছাদন হিসেবে সুতি ছাড়া অন্য কোনো কাপড় লাগানো উচিত নয়। এত কিছুর পরও যদি ঠান্ডা লেগেই যায় নবজাতকের সর্দি মুছতে রাবারের নেজল অ্যাসপিরেটর ব্যবহার করুন এবং দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

সোর্স: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-12-11/news/312266

Advertisements
This entry was posted in পত্র পত্রিকা, শিশু লালন পালন বিষয়ক. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s