শিশু সন্তানকে ভালো কাজে উৎসাহ দেবার সহজ একটা উপায়

সর্বশেষ সম্পাদনা: ১২-জুন-২০১২.
বাচ্চারা প্রতিদিন নানা ধরনের ঝামেলার কাজ করে থাকে। ওরা এতো এ্যনার্জি পায় কোথায় বুঝিনা! বাপ্‌রে বাপ, সেই সকালে ঘুম থেকে উঠে খেলা আর খেলা। দুপুরে ঘুমের কথা বললে শোনেই না। রাতেও যেন ঘুমাবার নাম নেই। সত্যিই ওদের সাংঘাতিক এ্যনার্জি। বাচ্চারা সারাটাদিন দুষ্টমী করবে সেটাই যেন স্বাভাবিক। ওরা জিনিষপত্র ছুঁড়ে মারবে, ভাংবে, অগোছালো করবে, ফেলে দেবে এগুলিই যেন ওদের কাজ। দেখুন এই কাজগুলি আমরা ওদের হয়তো শেখাই না তারপরও ওরা এগুলিই করে আপন মনে। তারমানে এগুলি আমাদের মেনে নিতে হবে যে, শিশুরা এই ধরনের বিরক্তকর কাজগুলি করবেই। এখন আমাদের কাজ হবে, ওদেরকে লাইনে আনা, তাই না? আমরা অভিভাবক-গন যদি হাল ছেড়ে দেই ওদেরকে লাইনে আনতে তাহলে, তো হবে না, কি বলেন? ওদের দুষ্টুমী আচরনগুলি যেন কন্ট্রোলে আনতে পারে সেই শিক্ষাইতো দিতে হবে, তাই না?

এই বিষয়ে আমিও অনেক ভেবেছি। আমার যমজ বাচ্চাদুটিও যে বিরক্ত করেনি তা কিন্‌তু নয়। ওদের বিরক্তিতেও চিৎকার চেঁচামেচি করতে হয়েছে, সত্যি। আমি ভাবতাম এমন কোন ভালো উপায় আছে নাকি যার মাধ্যমে তাড়াতাড়ি ওদেরকে সাইজ করা যাবে (বকাঝকা, চিৎকার, মাইর দিয়ে কোন কাজ হয়না। খুব সময়িক কাজ হয় বটে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান এটা নয়।)। এখন যে বুদ্ধীটির কথা বলবো সেটা আমার আবিষ্কার নয়। কোন এক ব্লগে পেয়েছিলাম বুদ্ধিটি। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম বুদ্ধিটি খাটালে হয়তো আপাতত পজেটিভ কিছু পেলেও ভবিষ্যতের জন্য এটা নেগেটিভ প্রভাব ফেলবে। কিন্‌তু না, তা হয়নি এখন পর্যন্ত (জুন, ২০১২)। বরং আজ পর্যন্ত ভালো কাজ দিচ্ছে যদিও আমি নিজেই সব সময় বিষয়টি পালন করে আসতে পারছিনা বা করছিওনা। তবে কাজে দিচ্ছে।

বুদ্ধিটি হলো, শিশুদের ভালো কাজের জন্য ওরা কিছু কামাই করবে বা মন্দ কাজ না করার জন্যও কামাই করবে। ঠিক তাই, ইনকাম করবে। না ভাই, টাকা পয়সা ইনকাম করবে না। ইনকাম করবে কিছু টিকেট বা কুপন, যাই বলেন। সেই টিকেট বা কুপন তারা জমাবে এবং একটা পর্যায়ে সেই টিকেট দিয়ে তাদের মনের ইচ্ছা পূরন করবে। খুব সহজেই বুঝিয়ে দিলাম, বুঝলেন তো?

আমি কিভাবে বিষয়টি বাস্তবায়ন করি?
যেমন ধরুন ওরা সকালের নাস্তা খেতে প্রচুর সময় নিচ্ছে বা মারাত্নক ধিরে ধিরে খাচ্ছে। অমনি ঘোষণা দিয়ে দেই যে যদি আর ১০-১৫ মিনিটে সুন্দর করে গুছিয়ে (গাপুস-গুপুস করে নয়) খেয়ে ফেলে তবে সে টিকেট পাবে। আবার ধরুন ঘরে খেলনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে। অনেকক্ষন খেলা করেছে। এবার ওকে দিয়েই খেলনাগুলি গুছিয়ে রাখতে টিকেট দেবার ঘোষনা দেই। তেমনি যদি নিজের দাঁত নিজেই ব্রাস করে তাহলেও টিকেট দেই। এভাবে বিভিন্ন ভালো ভালো কাজের জন্য বা ওরা যদি ওদের কাজ নিজে নিজে সুন্দর করে করে তবে আমি ওদের টিকেট দেই।

টিকেট কিভাবে কাজে লাগাবে?
ওরা টিকেট হাতে পেয়েই খুব খুশী থাকে। অনেক প্রশ্ন করে টিকেট দিয়ে কি করতে পারবে সে সব বিষয়ে জানতে। আমিও ঘোষণা দেই যেমন, ৪টি টিকেট জমাতে পারলে আইসক্রিম খেতে দেবো। ৬টি টিকেট জমাতে পারলে মজার মুভিটি দেখতে দেবো। ৫টি টিকেট জমাতে পারলে কম্পিউটার গেম খেলতে দেবো একটু বেশীক্ষন ধরে। ইত্যাদি। আশা করি বুঝতে পেরেছেন। আমার বাচ্চারাই ডিসিশন নেয় যে, ওরা ওদের টিকেট দিয়ে কি করবে। যদি আইসক্রিম খেতে চায়, তবে এনে দেই এবং ওদের কাছ থেকে ৪টি করে টিকেট ফেরত নিয়ে নেই।

টিকেট বানাবো কি দিয়ে?
আমি টিকেট বানিয়েছি ইউজ না করা বাতিল বিজনেজ কার্ড দিয়ে। আমাদের অনেকেরই এমন ১-২ বক্স বিজনেস কার্ড পড়ে থাকে। সেগুলির অপরদিকটা সাদা থাকে। সেদিকে সাইন পেন দিয়ে মজার একটা ছবি এঁকে দেবেন। আর সেটাকে টিকেট হিসাবে দিয়ে দেবেন, ব্যাস। দেখবেন বেশ যত্ন করে রাখবে টিকেটগুলি। তবে যদি আপনার সময় আর সামর্থ থাকে তবে নিজেই কুপনের মতো করে কিছু একটা ডিজাইন করে প্রিন্টারে প্রিন্ট করে বানাতে পারেন কিছু একটা (আমিও একটু ট্রাই করেছিলাম) 🙂 । তবে পুরনো বিজনেস কার্ডেই সুবিধা বেশি। কারন, কার্ড একটু শক্ত হয়ে থাকে আর তাকে ওরাও যত্ন করে ধরতে বা জমাতে পারে। যদি আপনার বিজনেস কার্ডগুলি বেশী শক্‌ত হয় তবে কাঁচি দিয়ে কার্ডের শার্প কোনাগুলি কেটে একটু রাউন্ড করে দিতে ভুলবেন না।

টিকেটের প্রয়োগ:
আমি সব সময় ওদের মনের ইচ্ছাগুলি টিকেটের বিনিময়ে করাই না। বরং ওরা হয়তো টিকেট দিয়ে আইসক্রিম খেতে চাইলো, আইসক্রিম আনলাম, ওরা খেলো, টিকেট দিতে চাইলো আমাকে আর আমিও ঘোষনা দিলাম যে টিকেট লাগবে না, ওরাও আরো আনন্দে মেতে উঠলো এইভেবে যে টিকেটগুলি দিয়ে মনের অন্য ইচ্ছাগুলি পুরন করতে পারবে।

তবে টিকেট বিনিময় একমাত্র উপায় নয় শিশুকে ভালো কাজে উৎসাহ দেবার জন্য। শিশুর সাথে আচরনগত যে বিষয়গুলি অবশ্যই পালন করবেন সেগুলি এমন:
(ক) শিশুর যে কোন ভালো কাজের প্রসংশা করবেন বেশ ভালো মতোই। সাথে আরো বাড়তি কথা বলবেন। যেমন: “বাহ্‌ তুমিতো বেশ সুন্দর করে তোমার পোষাকগুলি গুছিয়েছো! জানো আমি যখন ছোট ছিলাম তোমার মতো করে এমন সুন্দর করে গোছাতে পারতাম না।” যদি এভাবে কথাগুলি বলতে পারেন তবে দেখবেন আপনার সন্তান বেশ উৎসাহ পাবে।

(খ) সন্তানের বিভিন্ন ভুল কাজে নিরুৎসাহিত করবেন না। শিশুরা বিভিন্ন কাজে ভুল করবেই। সেই ভুল ধরিয়ে শুধরিয়ে দেয়াই আমাদের কাজ, এটা মাথায় রাখবেন। কেন আপনার সন্তানকে একটা কথা চৌদ্দবার বলতে হচ্ছে, এই ধরনের চিন্তা মাথায় রাখবেন না। বারবার বলতে হবে এটাই স্বাভাবিক। একটা ভুল করলেই যদি ধমক দেন, চিৎকার দেন, থাপ্পর দেন তবে কিন্তু সে মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনবেনা। বরং বাড়তি ভয়ে থাকবে এবং আরো ভুল করতেই থাকবে। বরং যখন প্রথমবার ভুল করবে তখনি কাছে বসিয়ে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে দিন। বোঝাতে গিয়ে আপনার ছোট বেলার ঘটনা বলুন। বা আপনার বন্ধুর জীবনে ঘটে যাওয়া ভুল ঘটনাটি বলুন। সাথে আরো কিছুক্ষন যদি ঘটনাটি নিয়ে বাচ্চার সাথে কথা বলেন তবে দেখবেন সে ভুল কাজটা সহজে আর রিপিট করবে না। কারন প্রথমবারেই আপনি যথেষ্ট সময় নিয়ে তার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন বিষয়টি।


এই পোষ্টি আরো কিছু ব্লগ/ফোরামে প্রকাশিত হয়েছিল এবং দেখুন সেখানকার ব্লগারগন কি মন্তব্য করেছেন।

রিগ্যান: দারুন, এ সিস্টেমটা আমার ছোট দুই শিশু কাজিনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সুফল পেয়েছিলাম
Orion: Amar Idea er sathea mil asea. Thats means ami o ai tips gulo kajea lagai. Thanks a lot.
পলাশ: সুন্দর পরামর্শ দিলেন, কাজে লাগবে। পুরস্কার একটা ভাল পদ্ধতি শিশুদের বাগে আনার!
সমকালের গান: খুব ভাল বলেছেন। আমিও এমন কিছু করার চেষ্টা করি। সবসময় যে কাজে দেয় তা নয়, তার পরও অনেক লাইফ সেভিং।
সফিকুল: অসাধারন লাগলো অপনার পরামশর্। অশাকরি অনেকেই উপকৃত হবেন।
কামাল উদ্দিন: ভালো লেগেছে, আমি এমন কিছু একটা চেষ্টা করবো ।
ওরাকল: হুম আইডিয়াটা মন্দ নয়, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।


আপনার সন্তানকে নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকলে এখানে ক্লিক্‌ করে প্রশ্ন করতে পারেন।

Advertisements
This entry was posted in আচরন, কথা বলা, কাজকর্ম, শিশু, শিশু লালন পালন বিষয়ক, শিশুরযত্ন. Bookmark the permalink.

14 Responses to শিশু সন্তানকে ভালো কাজে উৎসাহ দেবার সহজ একটা উপায়

  1. Fahmida meem বলেছেন:

    Thanks vaiya for your nice and effective effort. Its really a great work and helpful for all parents.

  2. Rezia Parvin বলেছেন:

    I think it will work..Thanks

    Rezia

  3. Md. Golam Mostafa বলেছেন:

    Shiblee, really good. Mama

  4. Arafat Rahman বলেছেন:

    The idea!
    আমার মনে ধরেছে।

  5. Sanjida Gafur বলেছেন:

    Shiblee bhai
    khub shubdar hoise

  6. Mardia বলেছেন:

    সত্যিই ভালো উপায়।আমার মেয়েটা আর একটু বড় হলে শুরু করবো ইনশা আল্লাহ।আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।সোনামানিক দুজন ভালো আছে?

  7. saydujjaman বলেছেন:

    Very good writing, this actually applicable for everyone not only kids. In office use the same technique (modified ) you will get result in the same way. People will work without tiredness when s/he love to do the job. Its human psychology!

  8. shipon molla বলেছেন:

    vishon dorkari post.songrohe rekhedilam.

  9. তানিয়া বলেছেন:

    হুম, এই রকম রেইনফোর্সের কথা পড়েছি। কিন্তু বাস্তবে আপনাকে ইউজ করতে দেখলাম। আপনার লেখা পড়ে আপনাকে বিজ্ঞানী পিঁয়াজের মত মনে হচ্ছে।

  10. মহিউদ্দিন বলেছেন:

    দারুন আইডিয়া !!!
    এখন একটা বাচ্চা দরকার 😛

  11. Ezaz Uddin Ahmed, Shanto বলেছেন:

    শিবলী ভাই, আইডিয়াটা প্রয়োগ করতে চাই। তবে একটা doubt কাজ করছে যে, এতে হয়তো পরবর্তীতে ওদের কে দিয়ে যে কোন কাজ করাতে গেলেই টিকেট বা কিছু একটা দিতে হবে। হয়তো বড় হয়ে পেশাগত জীবনেও এর প্রভাব পড়বে, আপনি কী মনে করেন?

    • Shiblee বলেছেন:

      এই সন্দেহটা আমারো ছিলো। কিন্তু সত্য বলছি একদম ভয় নেই। কারণ প্রথম প্রথম সকল ভালো কাজ করার জন্য বা মন্দ কাজ না করার জন্যই কুপন পাবে। এভাবে ওদের ভালো কাজ নিজে করা বা মন্দ কাজ নিজে বাদ দেবার অভ্যেস হয়ে যাবে। ক্রমে ক্রমে শুধু সিলেক্টেড কিছু ভালো কাজের জন্য কুপন পাবে। এভাবে বড় হতে হতে ও নিজেও বুঝে যাবে কোন ভালো কাজ এমনি এমনিই করতে হয় আর কোন ভালো কাজগুলি আয়োজন করে করতে হয়। যেমন বলে রাখি, প্রথম প্রথম যখন ওদর বয়স ৪-৫, তখন নামাজ আদায় করাবার জন্যও কুপন দিতাম। কিন্তু যখন কুপন দিতাম তখন বলে দিতাম, “নামাজ আদায় করার জন্য কুপন দিলাম না। বরং তুমি আমার কথা শুনেছো সেটার জন্য কুপন দিলাম। কিন্তু নামাজ আদায় করার পুরষ্কার তোমরা আল্লাহ্‌র কাছ থেকেই পাবে।” এভাবে যখন ৬ বছর বয়স হলো, আর নামাজের জন্য কুপন দেইনা ওরাও চায়না। কারণ ওরা জেনে গেছে যে নামাজ পড়তেই হবে।

      আরেকটা উদাহরন দেই। যখন ওদের বয়স ৫ ছিলো প্রতি রাতে বিছানায় বালিস/কাঁথা আনার জন্য কুপন দিতাম। কিন্তু যখন দিতাম, তখনি বলে দিতাম “ঘরের কিছু কিছু কাজ আমি করবো, কিছু কাজ আম্মু করবে, কিছু কাজ তোমরাও করবে। এখন কুপন দিচ্ছি কিন্তু যে কাজগুলি তোমাদের জন্য ভাগ করে দেবো সেগুলির জন্য আর কুপন পাবেনা বড় হলে।” ওরা জানতে চেয়েছিলো, “তাহলে কিভাবে কুপন পাবো?” বলেছিলাম, “বড় হতে থাকো আরো অনেক ভালো কাজ আসতেই থাকবে। বরং যতো বড় হতে থাকবে ততোই ভালো কাজ করার সুযোগ পাবে।” ওরা এখন আর কাঁথা/বালিস আনবার জন্য কুপন পায়না এবং তাতে ওদের কোন মনকষ্টও নেই। বরং ওরা বুঝতে পারছে যে, বড় হবার সাথে সাথে আরো চ্যালেঞ্জিং কাজ জীবনে আসছে/আসবে।

      আরেকটা উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। ওদের এখন একটাই টার্গেট। সাইকেল। সাইকেলের জন্য আমি ওদেরকে কুপন সংগ্রহ করতে বলেছি। বেশ জমিয়েছে। কিন্তু আমার মন্দ কাজ করে ফেললে কিছু কুপন নিয়ে নেই। ওরাও বুঝে গেছে যে, কন্ট্রোলে থাকতে হবে। দেখি ঈদের পর হয়তো ওরা সাইকেল পাবার মতো কুপন সংগ্রহ করে ফেলবে। 🙂

      সো, ভয় পাবার কিছুই নেই। প্রতিদিনের প্রতিটি কাজের সাথে কুপনকে জড়িত করার দরকার নেই। তাহলে সব কাজের বিনিময়েই ওরা কুপন চাইবে। বরং ছোট বেলা থেকেই বুঝিয়ে দিতে হবে কোন কাজগুলি এমনি এমনিতেই করা উচিত বা করতে হবে আর কোন কাজগুলির জন্য মা-বাবারা অতিরিক্ত খুশি হয়। সো, আমরা যদি বোঝাতে পারি ওরাও বুঝবেই। এবার বলো, আমি কি তোমাকে বোঝাতে পারলাম? 😀

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s