আমাদের বাচ্চাকে কি একদমই ভয় দেখাবো না?

সর্বশেষ সম্পাদনা: ১০-ডিসেম্বর-২০১০. একটি লিংক্‌ আপডেট করা হয়েছে মাত্র।
এইতো গত সপ্তাহে লিখলাম ‘বিছানার তলে কে রে?‘। সেখানে আমি কথা বলেছি কিভাবে আমরা শিশুদের ভয় দেখাই আর সেই ভয়ে একজন শিশু কিভাবে ভয় পায়। শেষে আবেদনও করেছিলাম যেন আমরা শিশুদের ভয় না দেখাই। কিন্তু আজ বলছি, আমাদের বাচ্চাকে কি একদমি ভয় দেখাবো না? এক মুখে দুই কথা বলছি, তাই না? না ভাই, দুই কথা বলবো না। আমার মতে কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের শিশুদের অবশ্যই ভয় দেখাতে হবে কিন্তু ঠিক সেই ভয় নয়, যা আমি গত সপ্তাহের লেখায় বুঝিয়েছিলাম। বরং সেই ভয় যা তাকে বুঝতে শিখাবে, নিজেকে ও অপরকেও সাবধান হতে শেখাবে। আসুন আসল কথায় আসা যাক।

আমি মনে করি নিচের এই জাতিয় বিষয়ে শিশুদের ভয় দেখানো উচিত।
(ক) আগুন বা গরম জিনিষ থেকে (খ) বৈদ্যুতিক জিনিষ বা বিদ্যুত থেকে (গ) ধারালো কিছু থেকে (ঘ) অনিরাপদ ছাদ, বারান্দা ও জানালা থেকে (ঙ) রাস্তা পারাপার থেকে (চ) অপরিচিত জনের থেকে। (ছ) কীটনাশক [মশার কয়েল, এ্যারোসল…] (জ) ইত্যাদি ইত্যাদি। বোদ্ধারা বুঝেই গেছেন কেন এই বিষয়গুলি হতে শিশুর সাবধান থাকা উচিত বা কেন এগুলি একজন শিশু ভয় পাবে।

যেহেতু আজ আমি বলছি উপরের বিষয়গুলি নিয়ে শিশুদের ভয় দেখাবেন তাই হয়তো ভাবছেন ব্লগটি আর পড়ার দরকারই নেই। কারন আমরা সবাই ভয় দেখাতে পারি। না পাঠক, একটু রসিকতা করলাম। সময় থাকলে দয়া করে আর একটু পড়ুন।

আমরা usually উপরের বিষয়গুলি নিয়ে একজন শিশুকে কিভাবে ভয় দেখাই সেটা সম্ভবত আমাদের কারো অজানা নেই। কিন্তু কিভাবে ভয় দেখানো যেতে পারে সেটাই বরং আলাপ করবো। আলাপ করার আগে বলি শিশুদের একটি বিষয় মাথায় রাখবেন, পৃথিবীর সকল বিষয়ে ওদের মারাত্নক রকমের আগ্রহ। আর আপনার আমার উচিত হবে না সেই আগ্রহটাকে ধমক বা মাইর দিয়ে বন্ধ করে দেয়া। এতে আপনার শিশুর চিন্তা করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সে ক্রমেই বিভিন্ন বিষয়ে আগহ হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু আমি আপনি ভালো করেই জানি, ও আর একটু বড় হলেই এই পৃথিবীর সকল জ্ঞান নেবার জন্য বেষ্ট টিচার, বেষ্ট কোচিং, বেষ্ট বিদ্যালয় দিতে আমরা প্রস্তুত। তো আসুন যা বলতে যাচ্ছিলাম।

আর সকল বিষয়ের মতো আগুন নিয়ে আপনার শিশুর আগ্রত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সে এটা দেখতে চাইবে, ধরতে চাইবে, খেতে চাইবে। আমাদের কাজ হবে আগুনের আচরণ কেমন সেটা নিজে জানা ও শিশুকে শেখানো। সাথে কিছু সত্য/মিথ্যা গল্প দিয়ে শিশুটিকে বোঝানো। তারপর প্রয়োজনে আগুন নিয়ে মজার খেলাও খেলা যেতে পারে। আর এই কাজগুলি লাগাতার মাত্র ৫-১০ দিন করলেই আপনার শিশুর ভেতর পাকাপোক্‌ত হয়ে যাবে যে আগুন আসলে ভয়ের কিছু নয় বরং এটাকে সাবধানে ও সঠিক ভাবে কন্ট্রোল করতে হয় কিন্‌তু সাথে সাথে সে সাবধানও থাকবে। ভ্রুটা একটু কুচকালেন, তাই না? ৩-৪ বছরের শিশুর কি সেই বোধ জ্ঞান আছে যে আগুন নিয়ে শেখাবো-বোঝাবো, আগুন নিয়ে আবার মজার খেলাও খেলবো! যদি আমার একটি কথাও বিন্দুমাত্রও convincing মনে হয় তবে অনুরোধ করবো কোন শিশুকেই under estimate করবেন না। ওরা বুঝতে পারবে কি পারবে না সেটা নির্ভর করবে সেই বিষয়ে আমার আপনার জ্ঞান কতোটুকু আর আমরা সেই জ্ঞানকে কিভাবে তার কাছে উপস্থাপন করছি। তারমানে মানুষ বানাবার কারখানাটা আসলে আমি আপনি ও আমরাই। যাই হোক, আবেগী কথা বাদ দিয়ে আসল কথায় ফিরে যাই।

ধরে নিলাম কারেন্ট চলে গেছে। মোমবাতি জ্বালালেন আর অমনি সুনাতা আকৃষ্ট হয়ে মোমবাতির কাছে গিয়ে ওটা ধরার চেষ্টা করছে। তো, তাকে ধমকে আগুনের কাছ থেকে বিদায় করার চাইতে বরং সুনাতকে নিয়ে মোমবাতির কাছে বসুন। একটু আদুরে + মোটা কন্ঠে + বাচ্চা সুলভ আচরণের সাথে বলুন, “ওলে বাবা, তুমি কি আগুন ধলবে নাকি সুনাতা! ওতা ধলোনা তোমাল হাত পুলে যাবেতো!” এভাবে ওকে একটু ওয়ার্ম আপ করে নিলেন যেন সে আপনার কথা শুনতে আগ্রহী হয়। ওভাবে শুরু করে এবার শুধু আদুরে + মোটা কন্ঠে এভাবে কথা চালিয়ে যেতে পারেন, ‘তুমি জানো আমি ছোট বেলায় ভুল করে আগুন ধরে ফেলেছিলাম আর অমনি ধুপ করে আমার হাতে ফোসকা পড়ে যায়। ইস্‌ যা কষ্ট পেয়েছিলাম! অনেক দিন ঠিক মতো খেলতেও পারিনি। খেলনা ধরলে ব্যাথা পেতাম, কোন কিছু ধরলেই ব্যাথা পেতাম।’ সুনাতা: ‘ফোসকা কি?’ আপনি: ‘যদি আমাদের গায়ে-হাতে আগুন লাগে তবে ওখানে পুড়ে যায়। আর পুড়ে গেলে ওখানে ঘা হয়ে যায়। পানি জমে এই সুন্দর হাতটায় ঘা হয়ে যায়। আর ঐ ফোসকা অনেক ব্যাথা করে।’ এবার দেখবেন সে অলরেডি একটু সতর্ক হয়েই যাবে। এবার একটা অভিনয় করে দেখতে পারেন। সেটা হলো, আপনি নিজের একটা আঙ্গুল মোমের আগুনের কাছাকাছি এনেই উফ্‌ করে সরিয়ে ফেলবেন এবং বোঝাবেন আগুন না ধরে ভালোই করেছেন। এবার সুনাতাকে প্রশ্ন করুন (দেখবেন সুনাতাও উত্তর দেবে),
– বলো আম্মু, তুমি কি আগুন ধরতে চাও?
– না, ধলবো না।
– তুমি কি আগুনের কাছে বসবে?
– না, বসবো না।
– তুমি কি আগুন দিয়ে খেলা করবে?
– না, কলবো না। আগুন দিয়ে খেলবো না।

(২য় পাতায় পড়ুন, এরপর বানিয়ে বানিয়ে কি ধরনের গল্প বলা যেতে পারে সেই বিষয়ে।)


যদি এই লেখার বক্তব্য ভালো লেগে থাকে এবং যদি প্যারেন্টিং বিষয়ে আরো আলোচনা করতে চান তবে Facebook Group-এ যোগ দিন। এই গ্রুপে আমরা প্রধানত বাংলায় আমাদের সন্তানদের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে থাকি।


আর যদি হাতে একটু সময় থাকে ২-৪-৫-১০ মিনিটের কিছু ছোট ছোট video clip দেখবার তবে অবসরে চা/কফি খেতে খেতে আমার YouTube Channel টি ভিজিট করতে পারেন। আমার বিশ্বাস এই Channel টির অধিকাংশ video clip আপনার পছন্দ হবে।


No reproduction of this article may be made including electronic or paper reproduction without the express written consent of the author.

This entry was posted in আচরণ, কথা বলা, শিশু, শিশুরযত্ন and tagged , , , , , , . Bookmark the permalink.

আমাদের বাচ্চাকে কি একদমই ভয় দেখাবো না?-এ 7টি মন্তব্য হয়েছে

  1. আব্দুল্লাহ বলেছেন:

    ভাল বলেছেন! আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
    কিন্তু এগুলো করতে গেলে মিথ্যা হয়ে যায় যে!

    • আব্দুল্লাহ ভাই আপনাকেও ধন্যবাদ সময় নিয়ে পড়ার ও মন্তব্য করার জন্য। এবার মিথ্যা হয়ে যাওয়া প্রসংগে একটু বলি। সম্ভবত আপনি এই অংশটুকুকে ইংগিত করেছেন। “একবার দুইভাই বোন খেলা করছিলো। ওরা তোমার মতোই ছোট ছিলো। একদিন ওরা রান্নাবান্না খেলছিলো। … …”

      এ কথা সত্য যে এটুকু মিথ্যা। আমার আরো লেখাতেও এটা পাবেন যে আমি অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর সাথে কিছু মিথ্যা গল্প বলার পরামর্শ দিয়েছি। আমার মনে হয় এই ধরনের মিথ্যায় শিশুদের কোন ক্ষতি হয়না, বরং লাভটাই বেশী। যেমন এটা পড়ে দেখতে পারেন, আসছে শীতে শিশুর যত্ন। অন্য একটা কথা বলে উদাহরণ দেই। সম্ভবত সকল শিশুই তার জন্ম রহস্য জানতে চায় ৩-৪ বছর বয়সেই। এখন বলুন আমরা যদি শিশুকে সত্য কথা বলতে চাই তবে বিয়ে, বিয়ের গুরুত্ব, দাম্পত্য জীবন, গর্ভে আসা এই সকল বিষয়ে বলতে হবে একদম সত্যটা। হয়তো এই সত্যটা তাকে এই বয়সে বিভ্রান্ত করবে। আর তাই আমাদের নানী-দাদী ও মা-খালারা বলতো রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে (কারন তখন নরমাল ডেলিভারীই হতো) আর এই যুগে অনেকে বলে হাসপাতাল থেকে এনেছে (কারন এখন সিজার করেই সন্তান জন্মের হার বেশী।) 🙂

  2. nhm tanveer hossain khan বলেছেন:

    WoW! shiblee bhai, i totally agree with your perception 🙂 so far i know it’s called reverse physiology. thanks for sharing. keep posting more of these things 🙂 so i can share it with my fiance 😀

  3. Monirul Islam বলেছেন:

    ভালো লেগেছে। বিশেষ করে বানানো গল্পগুলো, এমন গল্প বললে বাচ্চারা তো ছাড়তে চাইবেনা। আসলে এইভাবে কখনও ভাবি নাই। একটা মিথ্যা গল্পও অনেক কিছু শেখাতে পারে।

  4. সুশান্ত কর বলেছেন:

    দারুণ লিখেছেন। ধন্যবাদ পড়াবার জন্যে।

  5. তানিয়া বলেছেন:

    এটাকে ভয় দেখানো না বলে সচেতনতা বললে ভালো হয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s