বিছানার তলে কে রে?

সর্বশেষ সম্পাদনা হয়েছে: ২৬-নভেম্বর-২০১০ রাত ১১টা। ৪র্থ পাতায় আরো একটি সত্য ঘটনা যোগ হয়েছে।
“বিছানার তলে কে রে! ওরে বাবা, তাড়াতাড়ি ঘুমাই।”, “ওরে বাবা, বারান্দায় কিসের যেন শব্দ! ঘুমাও ঘুমাও।” এই জাতিয় নানা ধরনের কথা বলে আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে ভয় দেখাই। আমি বুঝি আমরা অনেক সময় কতোটা অসহায় না হলে আমাদের প্রিয় সন্তানকে ভয় দেখিয়ে ঘুম পারাই বা খাবার খাওয়াই। সব সময় অসহায় হয়েই যে করি তাও নয়। আমরা অনেকেই বুঝিইনা এমনটা করা কতোটা ক্ষতিকর! কিন্তু কখনই কি একটু ভেবে দেখেছেন এই সামান্য ভয় তাদের ভেতর কিভাবে কাজ করছে? ভাবেননি নিশ্চই। আসুন একটু ভেবে দেখা যাক আমার দৃষ্টি ভংগিতে।

আমরা সাধারনত তখন থেকেই আমাদের শিশু সন্তানকে ভয় দেখাই যখন থেকে সে ‘না’ বলা শেখে বা জিদ দেখায় বা খাবার খেতে চায়না, ঘুমাতে চায়না ইত্যাদি। তারমানে যখন কিনা তার বয়স এক-দেড় বছর আর সম্ভবত এই ভয় দেখানো চলতে থাকে ৪-৫ বছর বয়স পর্যন্ত। আর সম্ভবত ৬-৭ বছর বয়স থেকে আমরা আর ভয় দেখাইনা বরং তখন ধমক, হুমকি, মাইর ইত্যাদি।

আসুন দেখা যাক সুনাতার মতো শিশুকে আমরা কিভাবে ভয় দেখিয়ে খাওয়াই বা ঘুম পারাই।
– বিছানার তলে কে রে! ওরে বাবা, সুনাতা তাড়াতাড়ি ঘুমাও।
– ওরে বাবা, বারান্দায় কিসের যেন শব্দ! এই সুনাতা জলদি ঘুমাও ঘুমাও।
– এ–ই—–চো–খ—ব–ন্ধ– ক–রো, নইলে আমি কিন্তু ঐ বুড়িকে ডা–ক  দে–বো। ইত্যাদি ইত্যাদি

বাচ্চার কথা ভুলে যান কিছুক্ষনের জন্য। ধরে নিন আপনি প্যারালাইজ্ড একজন, বিছানায় শুয়ে আছেন আর আপনি বুঝতে পেরে গেছেন যে, আপনার বিছানার নিচে দুজন ডাকাত আশ্রয় নিয়ে বসে আছে। আপনার ঘরের লোকজন বাইরে গেলেই ঐ দুজন নিচ থেকে বের হয়ে আসবে। হয় আপনাকে ওরা মেরে ফেলবে বা আহত করবে আর তারপর লুটপাট। আপনি প্যারালাইজ্ড, আর তাই আপনি ডাকাতের উপস্থিতির কথা বলতেও পারছেন না ঘরের মানুষকে। একবার ভেবে দেখুনতো ঐ সময়টায় আপনার কেমন লাগবে। আপনি মনেমনে চিৎকার করে আপনার পরিবারের জনকে বলছেন, ‘তোমারা ঘর থেকে বের হয়োনা। তোমরা আমাকে ঘর থেকে বের করো। বিছানার নিচে ডাকাত আছে।…’ আপনি আরো ভাবছেন, ‘একটু পরেই ওরা হয়তো আমাকে মেরে ফেলবে, আমার মৃত্যু হবে কিংবা আহত করবে…’

কেমন লাগলো এই কথাগুলি ভাবতে? যদি শিহরন বোধ না করেন তবে আরেকবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। যদি তাও শিহরণ বোধ না করেন তবে এবার ভাবুন ঐ প্যারালাইজ্ড মানুষটার জায়গায় আপনার বাচ্চা শুয়ে আছে। আর সত্যিই সত্যিই বিছানার নিচে আছে এক ছেলে ধরা। যে কিনা বাচ্চা ধরে নিয়ে যায়। আপনি আপনার বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে হয়তো গোসল করতে যাবেন আর এরই মাঝে ঐ ছেলে ধরা বের হয়ে আপনার বাচ্চাকে নিয়ে উধাও। (কি ভয়ংকর!), এবার কি শিহরণ বোধ করলেন!?

তবে কেন আমরা আমাদের শিশুকে এমন ভয়ংকর ভয় দেখাই! দেখুন, যে বাড়িতে আমরা আমাদের প্রিয় সন্তান নিয়ে বাস করছি, সেই শিশু সন্তানকেই ভয় দেখাচ্ছি যে বিছানার নিচে ছেলে ধরা আছে। আবার এটাও বলে দিচ্ছি যে ছেলে ধরা ধরে নিয়ে যায়। আপনার কি ধারনা এই সকল ভয়ে আমাদের বাচ্চারা তাড়াতাড়ি ঘুমায়? একদম মিথ্যা ধারনা। উপরে যে ডাকাতের উদাহরন দিলাম, তখন কি আপনার ঘুম আসতো/এসেছিলো? তবে ভয় পেলে কেন আমাদের বাচ্চারা ঘুমাবে বলুন?

(২য় পাতায় পড়ুন ভয় পেলে একজন শিশুর কি বিভৎস প্রতিকৃয়া হতে পারে।)


যদি এই লেখার বক্তব্য ভালো লেগে থাকে এবং যদি প্যারেন্টিং বিষয়ে আরো আলোচনা করতে চান তবে Facebook Group-এ যোগ দিন। এই গ্রুপে আমরা প্রধানত বাংলায় আমাদের সন্তানদের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে থাকি।


আর যদি হাতে একটু সময় থাকে ২-৪-৫-১০ মিনিটের কিছু ছোট ছোট video clip দেখবার তবে অবসরে চা/কফি খেতে খেতে আমার YouTube Channel টি ভিজিট করতে পারেন। আমার বিশ্বাস এই Channel টির অধিকাংশ video clip আপনার পছন্দ হবে।


No reproduction of this article may be made including electronic or paper reproduction without the express written consent of the author.

Advertisements
This entry was posted in আচরণ, শিশু, শিশুরযত্ন and tagged , , , , , , , , . Bookmark the permalink.

বিছানার তলে কে রে?-এ 11টি মন্তব্য হয়েছে

  1. মোস্তাফিজ রিপন বলেছেন:

    আপনার লেখাগুলো বেশ কাজের।

    শুভেচ্ছা রইল।

  2. Azad বলেছেন:

    Awesome post! Very nicely written !

  3. সহজ কথায় অসাধারণ উদ্যোগ। অন্ততঃ কিছু মানুষ আছে যে এইসব নিয়ে ভাবে এবং মানুষকে ভাবতে শেখায়। শিশুদেরকে অকষ্মাৎ ভয় দেখানো যে কত বড় অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে তা বোধহয়, আমার পরিবারের চেয়ে ভালো কেউ জানেনা।

    আপনারা হয়তো মৃগী (epilepsy) নামক ভয়াবহ রোগের নাম শুনেছেন যার পরিণতি হয় বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অকালে মৃত্যু। আমার ৫ বছরের ছোট ভাইয়ের রোগটি যখন ধরা পড়ে, ডাক্তার বলল এটা অনেকটা বংশগত রোগ। জানতে চায় আমাদের বংশে কারো এই রোগ আছে কিনা? না, আমাদের বংশে কারো এই রোগ কারো ছিলনা। তারপর উনি জানতে চাইলেন গত কয়েক বছরে বাচ্চাটি কি কোন ভয়ংকর কিছুর সম্মুখ্খীন হয়েছিল কিনা যা দেখে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।

    হ্যাঁ হয়েছিল। একবার আমাদের গৃহ পরিচারিকা তাকে নিয়ে খালের পানিতে খেলার সময় হঠাৎ উপর থেকে ছেড়ে দিয়েছিল, সেদিন সে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। ডাক্তার ধারণা করছিলেন সেখান থেকেই হয়তো রোগটির জন্ম। এরপর আমরা তাকে দেশের অনেক স্বনামধন্য নিউরোলজিস্ট কে দেখাই, এক পর্যায়ে (টানা ৭ বছর চিকিৎসার পর) সে ভালও হয় কিন্তু এতদিন তাকে বাইরের জগত থেকে আলাদা থাকতে হয়েছে বলে, এখন সে ২২ বছরের যুবক হয়েও ১২-১৪ বছরের কিশোরের মতো তার আচরন।

    অতএব, বাচ্চাকে ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকুন।

    • অসম্ভব রকমর মনটা খারাপ হয়ে গেলো ঘটনাটা পড়ে। চিন্তা করে দেখুন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটা মজা/ফান/ভুল একটা শিশুর জীবনকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আর কিছু কিছু ভুল/ক্ষতি থাকে যা আজীবনেও পূরণ হয়না। মন থেকে দোয়া রইল যেন আল্লাহ্‌ তার নিরাময় ও হেফাজত করেন এবং সেও যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেন।

  4. neeloy বলেছেন:

    excellent job done, shiblee bhai. want more like this type of article.

  5. মোঃ মহান উদ্দিন বলেছেন:

    আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আপনার চিন্তাভাবনা আর অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্যে। খুব ভাল লেগেছে। আর খুব কাজেও লাগবে আমাদের সবার।

  6. তানিয়া বলেছেন:

    বাচ্চাদের ভূতের ভয় কখনোই দেখানো উচিত নয়। আমি নিজেও এখনো ভূত ভয় পাই। যদিও খুব ভাল করেই জানি, পৃথিবীতে ভূত বলে কিছু নেই। এসব ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে আমরা বাচ্চাদের আত্নবিশ্বাস, সাহস নষ্ট করে দিই।

  7. Kawsar Hossain বলেছেন:

    অনেক নতুন কিছু জানলাম। কিছু তুচ্ছ আচরণও যে কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে তা বুঝলাম। আমি কি আর্টিকেলটি (অবশ্যই লিংক সহকারে) শেয়ার। করতে পারি?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s