ক্ষতিকর হ্যাকিং নাকি ভালোবাসা?

হ্যাকিং করে অন্যের ক্ষতি করাটা সব সময়ের নতুন প্রজন্মের জন্য একটা আনন্দের বিষয়। হ্যাকিং শব্দটার মাঝেই যেন অনেক গর্ব লুকিয়ে আছে। হয়তো বা শব্দটার মাঝে ‘কিং’ শব্দটা পাওয়া যায় বলে অনেক তরুন প্রজন্ম আরো গর্বে ফুলে উঠে।

আমি একজন হ্যাকার, আমি অনেক সাইট ভেংগে ফেলেছি, ওদের ওয়েব পেজে উল্টাপাল্টা ছবি দিয়েছি, ওদের তথ্যগুলিকে জোক্স দিয়ে রিপ্লেস করেছি, ওমুক এ্যাপ্লিকেশন ক্রাক্‌ করে বাজারে ছেড়ে দিয়ে অমুকের ব্যাবসা নষ্ট করেছি ইত্যাদি নানা ধরনের কথা বলে গর্ব বোধ করে অনেক হ্যাকার। (বড় বড় হ্যাকিং এর কথা বাদই দিলাম।) বন্ধুদের মাঝে অনেক আলোচিত হয়, বন্ধুরা বলতে গেলে একটু আধটু ভয়ও পায় তাদের হ্যাকার বন্ধুটিকে। কিন্তু হ্যাকিং করে যারা অন্যের ক্ষতি করে তারা একবারও ভাবেনা যে, তারা আসলে অন্যায় কাজ করছে। আর ১০টি অন্যায় কাজের মতো হ্যাকিং করে অন্যের ক্ষতি করাটাও একটা অপরাধ।

আমি শিবলী মেহেদী সফ্টওয়্যার টেষ্টার (software tester)। Software testing করে এর Bug/ত্রুটি ধরা এবং সম্ভাবনাময় সমাধান দেয়া আমার কাজ। আমার প্রফেশনের পাশাপাশি, সখের বসে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও এ্যাপ্লিকেশন টেস্ট করে সেটার Bug ও সেগুলির সম্ভাবনাময় সমাধানগুলি website owner কে বা প্রোগ্রামারকে জানিয়ে দেই। এতো বছরে হয়তো শতখানেক সাইটের জন্য এমন সেবা দিয়েছি সখের বসে। কাজটি করতে আমার খুব ভালো লাগে। অধিকাংশ site owner বা application owner শুভেচ্ছা বাণী পাঠিয়ে থাকেন আমার রিপোর্ট করা Bug পেয়ে, যা আমার ভালো লাগে! হালকা পরিচয় হয়, নিজের দেশ নিয়ে কথা হয়, ইত্যাদি। বেশ ভালই লাগে যখন বুঝতে পারি তারা আমার reported bug-এর উপর কাজ করছে।

প্রায় দু’বছর আগে একটা কোম্পানী এতোই খুশি হয়েছিল আমার bug report-এ যে, আমাকে টি-শার্ট গিফ্ট করেছিল (আরো দু-তিনটি গিফ্ট মিস করেছি আমাদের পোষ্টাল সার্ভিসের লোভের কারনে)। মুলত হয়তোবা তারা আমার reported bug-এর জন্য নয় বরং আমার attitude-এ খুশি হয়ে এমনটি করেছেন ওনারা। মানে আমি হয়তো পারতাম তাদের ত্রুটিগুলির মাধ্যমে তাদের সাইটেকে পরিবর্তন করে দিতে কিন্তু তা না করে বরং তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছি যে তাদের কিছু সমস্যার সমাধান করা উচিত। আর তাই হয়তো তারাও ছোট্ট গিফ্টের মাধ্যমে সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল বিভিন্ন সময়ে।

সম্প্রতি আমি all my notes organizer নামে একটি এ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে ইউজ করি। টুলটি আমার ভালো লাগে ও দরকারও হয়ে পড়ে। কিন্তু পাশাপাশি এ্যাপ্লিকেশনটির বেশ কিছু Bug/ত্রুটি পাই। যথারিতি আমার শখের বশেই সেই ত্রুটি গুলিকে কোম্পানীর মালিককে জানিয়ে দেই। সাথে আরো কিছু পরামর্শ দেই যা করলে তার এ্যাপ্লিকেশনটি আরো strong হবে। ইউক্রেইনে থাকা Volodymyr Frytskyy নামের এই প্রোগ্রামার (সাথে তিনি তার কোম্পানীর মালিকও বটে) আমার এই ধরনের attitude-এ খুবই খুশি হন এবং আমার পাঠানো বাগ্‌গুলির কোন প্রকার উত্তর না দিয়ে আগে তার এ্যাপ্লিকেশনটির আজীবন মেয়াদি লাইসেন্স-কী দিয়ে দেন গিফ্‌ট হিসাবে। উল্লেখ থাকে যে, আমি তার software-টির trial version ইউজ করছিলাম। আমি তার gift পেয়ে আরো খুশি হই! কারন তার এ্যাপ্লিকেশনটি আমার অনেক কাজে লাগবে আর মাত্র কয়েকদিনেই trial version-টির মেয়াদ শেষ হয়ে যেতো। আজীবন মেয়াদী লাইসেন্স পেয়ে আমি সাংঘাতিক খুশি হই।

এখানেই শেষ নয়। Volodymyr তার ওয়েব সাইটে আমার নাম প্রকাশ করে দেয় QA/Testers এর লিস্টে (Click This Link to see it)। নিজের নাম সুদুর বিদেশের এক ওয়েব সাইটে স্থান পাওয়া সত্যিই খুব আনন্দের বিষয়। আর যখন সেটা কিনা হয় শুধুই ভালোবেসে, তখনতো আনন্দের শেষ থাকেনা। (খেয়াল রাখবেন, আপনি যখন এই লেখা পড়ছেন, ততোদিনে ঐ লিষ্টে নাম নাও থাকতে পারে।)

ওখানেও শেষ নয়। আমি বাংলাদেশের ছেলে জেনে, সে বাংলাদেশ নিয়ে নেট থেকে একটু আধটু জানা শোনাও করে। তারপর সে আমাকে আরো সারপ্রাইজ দেয় তার হোম পেজে একটি নতুন জিনিষ দিয়ে। আমি চিন্তাও করতে পারিনি যে এমন অবাক করার মতো কান্ড সে ঘটাবে! শুধুমাত্র বাংলাদেশীদের জন্য সে ৭১% ডিসকাউন্টে তার এ্যাপ্লিকেশনটি বিক্রির ঘোষণা দেয়। আমি মুগ্ধ হয়ে যাই যে, হয়তো শুধুই আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তিনি এই কাজটি করেছেন। আমার দেশের পতাকা সহ, আমার নাম সহ, ৭১ (১৯৭১) সংখ্যাটি সহ লোগোটি দেখতে আমার খুবই আনন্দ হয়! হোম পেজ্‌ দেখতে এখানে ক্লীক্‌ করুন: http://www.vladonai.com/

এই হল একটি ঘটনা যা হয়তো বিরাট কিছু নয়। যা হয়তো কোন মাধ্যমে প্রচারের কিছুই নয়। কিন্তু আমি এই পুরো বিষয়টির সবচেয়ে বড় যে জিনিষটি তুলে ধরতে চেয়েছি সেটা এই যে, আমাদের নতুন প্রজন্মের যারা হ্যাকিং করে অন্যের ক্ষতি করে আনন্দ পাচ্ছে তারা চাইলেই ক্ষতিটা না করে বরং উপকার করে বিশ্বের নানা জায়গা থেকে অনেক ভালোবাসা পেতে পারে। আর সেই সাথে নিজের দেশ ও জাতিকে তুলে ধরতে পারে আরো উঁচুতে।

Volodymyr আমাকে পুরষ্কৃত করে শুধু আনন্দই দেয়নি সাথে সে আমার উপর নির্ভরশীলও হয়ে গেছে। সে চায় আমিই যেন তার এ্যাপ্লিকেশনটি টেষ্ট করি। আমি মনে করেছি, এই সবকিছু সম্ভব হয়েছে ‌আমাদের উভয়ের পজিটিভ্‌ আচরন ও রেস্পন্স এর মাধ্যমে।

আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা হ্যাকিং করে অন্যের অনেক ক্ষতি করছেন। সর্বনাস করছেন কারো তিলে তিলে গড়ে তোলা ব্যবসার। মজা পাচ্ছে এটা দেখে যখন তারা হ্যাকারের আক্রমনকে ঠেকাতে পারছেনা এবং বারে বারে তাদের আক্রমনের শিকার হচ্ছে, দয়াকরে আপনার (হ্যাকাররা) ট্যালেন্টকে পজিটিভ্‌ ভাবে ব্যাবহার করুন। দেখবেন দেশ ও বিশ্বের নানা জায়গা থেকে প্রচুর ভালোবাসা পাচ্ছেন। আর কে জানে আপনার প্রতি সেই ভালোবাসা হয়তো পুরো দেশেটাই পেয়ে যাবে একদিন।

This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s